Bir Savarkar and BharatRatna

 

কমল দাশঃ-  বিধানসভা ভোটের ইস্তেহারে সাভারকারকে “ভারতরত্ন” দেবার দাবি তুলেছে মহারাষ্ট্রের বিজেপি। ১৬ ই অক্টোবর ভোট প্রচারে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে এসেছেন যে সাভারকারের মূল্যবোধের ভিত্তিতে আমরা জাতিগঠনের ধারণাকে গড়ে তুলেছি। হ্যাঁ রত্নই বটে! মোদি সরকার ভারতমাতার এই বীররত্নকে “ভারতরত্ন” দিতেই পারেন। এমন কি নাথুরাম গডসেকেও একই ভূষণে বিভূষিত করলেও আমি বিন্দুমাত্র বিস্মিত হব না। কারণ ছোট বেলায় শিখেছিলাম – রতনে রতন চেনে,,,, সে যাই হোক সাভারকার কেমন রত্ন তা একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক।

Bir Savarkar and BharatRatna

Advertisement

Bir Savarkar and BharatRatna

এ কথা সত্য যে প্রথম জীবনে সাভারকার স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন সক্রিয়ভাবে। ১৯০৭ থেকে ১৯০৯ এই দুবছর তিনি নানারকম বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯১০ সালে নাসিকের কালেটর এ এম টি জ্যাকসনকে হত্যা করতে গিয়ে ধরা পরেন অভিনব সোসাইটির এক সদস্য।জ্যাকসন হত্যায় যে বন্দুকটি ব্যবহার করা হয়েছিল সেটি সাভারকার সরবরাহ করেছেন বলে প্রমাণিত হয় এবং তাঁকে আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলর জেলে ৫০ বছরের জন্য বন্দি করে রাখার নির্দেশ দেওয়া।জেলের মধ্যে তিনি কোন ক্যাটাগরির আসামী তা নিয়ে বিস্তর লড়াই সংগ্রাম করেন এবংতাঁকে কেন উপযুক্ত খাদ্য-পানীয় সরবরাহ করা হচ্ছে না তা নিয়ে জেল কর্তাদের সঙ্গে যথেচ্ছ আন্দোলন করেন।।

এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল।এরপর তিনি যা করলেন তা সাধারণ মানের একজন বিপ্লবী ভাবতেও ঘৃণাবোধ করতেন হয়ত। ১৯১১ সালের ৩০ আগস্ট তিনি ইংরেজ সরকারের কাছে ক্ষমাভিক্ষা চেয়ে একটি আবেদন করলেন। তাঁর আবেদন পত্র গৃহীত হল না। সাভারকার হাল ছাড়লেন না। ১৯১৪ সালের ১৪ নভেম্বর বীর সাভারকার দ্বিতীয়বার ক্ষমাভিক্ষা চেয়ে আবেদন করলেন। আবেদন পত্রে লিখলেন “সরকার যদি তাদের বহুমুখী দয়ার দানে তাকে মুক্ত করে দেন তবে আমি আর কিছু পারি বা না পারি চিরদিন সাংবিধানিক প্রগতি এবং ব্রিটিশ সরকারের আনুগত্যের অবিচলিত প্রচারক হয়ে থাকব।,,,,সরকার আমাকে যত কাজ করতে দেবেন ,সেই মত আমি সব কাজ করতে প্রস্তুত। কেননা আমার আজকের পরিবর্তন যেহেতু বিবেকের দ্বারা পরিচালিত, তাই আমার ভবিষ্যৎ আচরণও সেই রূপ হবে। অন্যভাবে যা পাওয়া যেতে পারে তা আমাকে জেলে আটকে রাখলে পাওয়া যাবে না।শক্তিশালীর পক্ষেই একমাত্র ক্ষমাশীল হওয়া সম্ভব। কাজেই অনুতপ্ত সন্তান পিতৃতুল্য সরকারের দরজায় ছাড়া আর কোথায় ফিরে যাবে। মহামান্য হুজুর বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন এই আশা রইল”(পেনেল সেটেলমেন্টস ইন আন্দামান)

এখানেই শেষ নয়। জেলমুক্তির আবেদন পত্রে তিনি আরো লিখেছিলেন “সরকারের বশ্যতাস্বীকার করে আমার মনে যে পরিবর্তন এসেছে, তার বলে আমি একদা ভারতে এবং বিদেশে আমার যারা অনুগামী ছিল, তাদেরকেও আমি ভ্রান্ত পথ থেকে ফিরিয়ে এনে সঠিক পথে পরিচালনা করতে পারি। আমার সামর্থ্য এবং ক্ষমতায় যতখানি সম্ভব, ততখানি ব্যবহার করে আমি সরকার বাহাদুরের অনুগত হয়ে থাকতে চাই, কারণ আমি সজ্ঞানে আমার মধ্যে এই বদল ঘটাচ্ছি। মহামহিম সরকার বাহাদুর যেন দয়া করে আমাকে ক্ষমা করেন, মহামহিম সরকার বাহাদুর ছাড়া আর কে এক দুষ্ট, বিগড়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরিয়ে আনবে তার পিতার ঘরে?” বাংলা অনুবাদের পাশাপাশি মূল আবেদন পত্রের কিছুটা অংশ তুলে দিলাম যাতে “বীর“ সাভারকারের বীরত্ব আরো পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হয় -“my conversion to the constitutional line would bring back all those misled young men in India and abroad who were once looking up to me as their guide. I am ready to serve the Government in any capacity they like, for as my conversion is conscientious..The Mighty alone can afford to be merciful and therefore where else can the prodigal son return but to the paternal doors of the Government?” ইংরেজদের প্রতি সাভারকারের এই আনুগত্যকে অনেকে মনে করেন জেল থেকে মুক্তির জন্য এক ধরনের কৌশল- শিবাজিট যেমনটি করেছিলেন। সেটা হলে বোধ হয় সাভারকারকে ভারতরত্ন পেতে বিজেপি শাসন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হত না। তার আগেই পেয়ে যেতেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় বাস্তবে তা ঘটিনি । জেল থেকে বেরিয়ে এসে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিবর্তে ব্রিটিশদের আরোপিত সমস্ত শর্ত বাধ্য অনুচরের মত অক্ষরে অক্ষরে পালন করে সরকার ফ্রেন্ডলি হয়ে উঠেছিলেন । এখন প্রশ্ন এহেন সুনাগরিককে” বীর” উপাধি দিয়ে ভারতরত্ন দেওয়া কতটা যুক্তি সঙ্গত তা আপনারা একবার ভেবে দেখবেন।

সাভারকার হলেন দেশের প্রথম সাম্প্রদায়িক নেতা। জ্যোতির্ময় শর্মা তাঁর হিন্দুত্বঃএক্সপ্লোরিং দ্য আইডিয়া অফ হিন্দু ন্যাশনালিজম বইতে দেখিয়েছেন যে সাভারকারের সামাজিক এবং রাজনৈতিক চিন্তাধারার মধ্যে সাম্প্রদায়িক মানসিকতা কিভাবে প্রথিত ছিল।১৯২৩ সালে কারাবাসের শেষদিকে সংকীর্ণ হিন্দুত্বের আদর্শ প্রচারের উদ্দেশ্য “এসেন্সিয়াল অফ হিন্দুত্ব” নামে একটি বই লিখেছিলপন সাভারকার;দ্বিতীয় সংস্করণে যার নাম দিয়েছিলেন “হিন্দুত্বঃহু ইজ আ হিন্দু? কি আছে এই স্বল্প আয়তনের বইটিতে? বইটি ভালো করে পড়লে দেখা যাবে এতদিন ব্রিটিশদের প্রতি তিনি যে বিদ্বেষ পোষণ করতেন তা ঘুরে গিয়ে মুসলমানদের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
“মহামেডান আর খ্রিষ্টানদের ধর্ম”, গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, “ভারতের মত একটি কোহেসিভ নেশন কেবলমাত্র সেই সমস্ত অধিবাসীদের নিয়েই গঠিত হতে পারে, যারা কেবল পূর্বপুরুষের বসবাসের সূত্রেই এখানকার অধিবাসী নন, বরং যারা এই দেশকেই তাদের ঈশ্বরের দেশ বলে মনে করে, তাদের সাধুসন্তের দেশ বলে মনে করে, যাদের পুরাণ উপকথা কেবল এই দেশের মাটিকে ঘিরেই রচিত হয়”। এই লেখার মধ্যে দিয়ে সাভারকারের ইঙ্গিত অত্যন্ত স্পষ্ট। মুসলমানদের সম্পর্কে তিনি আরো লেখেন“নিঃসন্দেহে তাদের জন্মভূমি আর তাদের পয়গম্বরের জন্মভূমির মধ্যে বিভক্ত। মুসলমানরা স্বাভাবিকভাবেই তাদের পয়গম্বরের স্মৃতিবিজড়িত দেশকে তাদের জন্মভূমির থেকে বেশি পবিত্র মনে করে, বেশি আনুগত্য দেখায়”। ১৯২০ সালে এইভাবে যুক্তির জাল বিছিয়ে সুকৌশলে তিনি দেশবাসীর মধ্যে সাম্প্রদায়িককতার বিষবাষ্প ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এহেন বিভেদকামী সাম্প্রদায়িক নেতাকে বীর অভিধায় ভূষিত করে ভারতরত্ন প্রদানের যৌক্তিকতা কোথায়?

Advertisement

সাভারকার গান্ধী হত্যার অন্যতম ষড়যন্ত্রী। এই মামলায় পুলিশ ১১ জন আসামীকে গ্রেপ্তার করেন। মামলার রাজসাক্ষী দিগম্বর ভাড তার জবানবন্দিতে বলেন যে সাভারকারের সঙ্গে নাথুরাম গডসে এবং অন্যান্য আসামীদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং তারা বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতেন। দিগম্বরের এই বক্তব্য আদালত গ্রহণ করে। কিন্তু সরকারি গাফিলতিতে দিগম্বরের বক্তব্যের সমর্থনের উপযুক্ত corroboration কোর্টে দাখিল করা সম্ভব হয়নি। আর নাথুরাম গডসে সাভারকারের প্রভাবে এতটাই প্রভাবিত ছিল যে শত জেরা স্বত্তেও সাভারকারের নাম মুখে উচ্চারণ করেনি। ফলে সাভারকার সে যাত্রা নিশ্চিত শাস্তির হাত থেকে রেহাই পেয়ে যান।সরকারি ঔদ্যসীন্যে আইনের হাত থেকে মুক্তি পেলেও পরবর্তীকালে গান্ধী হত্যার তদন্তের উদ্দেশ্য গঠিত জীবনলাল কমিশন তাঁকে দোষী স্বাব্যস্ত করে। সাভারকারের দেহরক্ষী আপ্পা রামচন্দ্র কাসার এবং তাঁর সচিব গজানন বিষ্ণু ডামলে কমিশনের কাছে যে সাক্ষ্য প্রমাণ দেয় তার থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে গান্ধী হত্যার সঙ্গে সাভারকার সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তিন বছর ধরে তদন্ত করার পর জীবনলাল কাপুর তাঁর রিপোর্টে লিখেছেন” এই সমস্ত তথ্য একত্রিত করলে সাভারকার এবং তার দলবলই যে হত্যার ষড়যন্ত্রী”এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এখন প্রশ্ন হল ব্রিটিশের অনুগত,সাম্প্রদায়িক এবং গান্ধী হত্যার অন্যতম ষড়যন্ত্রকারীকে” বীর” উপাধিতে ভূষিত করলে ভারতরত্ন প্রদান করা ভারতরাষ্ট্রের মর্যাদা কতটা রক্ষিত হবে এবং সাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি কতটা সুবিচার করা তা আপনাদের একবার ভেবে দেখার অনুরোধ করছি।

 

সকল খবর সবার আগে ফেসবুকে ফ্রী পেতে চাইলে আমাদের পেজ লাইক করুন। Click Here..

 

মুখ্যমন্ত্রীর কাছে NET, SET ও Phd দের কলেজে সরাসরি নিয়োগের দাবী জানানো কতটা জরুরি? লিখেছেন _ নেট পাস ও বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে এম ফিল রত ছাত্র নিশিকান্ত ভূঞ্যা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.